আত্মবিশ্বাস কি? আত্মবিশ্বাস অর্জনের উপায়?
আত্মবিশ্বাস কি আত্মবিশ্বাস অর্জনের উপায়
আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায়
জীবনে বড় হতে চাইলে বা বড় কিছু করতে চাইলে আপনার ভাগ্যের চেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী প্রয়োজন। একজন আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তির মানসিক শক্তি অন্য কারো চেয়ে কয়েকগুণ বেশি থাকে। একমাত্র আত্মবিশ্বাসই ব্যক্তি ই পারে মানুষের নির্ভরশীলতা কমাতে।
আত্মবিশ্বাস ছাড়া কোনো কাজই সঠিকভাবে করা যায় না; ব্যর্থতার ভয় সব সময় মনে কাজ করে। আর ভয়ই জীবনের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ। দৃষ্টান্তের জন্য: ধরুন দু'জন লোক একটি গুহার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানে এই গুহার ভেতরে গুপ্তধন থাকতে পারে।
দুজনের হাতেই টর্চ, তাদের শারীরিক শক্তি প্রায় সমান। তবে তাদের মধ্যে একজন বিশ্বাস করেন যে তিনি চেষ্টা করলে ভিতরে লুকানো ধন বের করে আনতে সক্ষম হবেন। অন্যরা গুহার ভেতরে বিপদের কথা ভাবছেন। তাই প্রথমজন গুহায় প্রবেশ করল আর দ্বিতীয়জন ভয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। এখন যদি সত্যিই ভিতরে গুপ্তধন থাকে তবেই সাহসী মানুষটি উপকৃত হবে। একটি পুরানো ইংরেজি প্রবাদ আছে যেটি বলে, "যে গুহাটিতে যেতে আমরা সবচেয়ে বেশি ভয় পাই তার মধ্যে সবচেয়ে দামি ধন আছে।"
এটা ঠিক- সবাই আত্মবিশ্বাসী নয়। অনেকেই মোটেও আত্মবিশ্বাসী নন। এবং তাদের আত্মবিশ্বাসের অভাব তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ এবং কর্মে প্রতিফলিত হয়। ফলে তাদের সাথে কিছু করার আস্থা অন্যদের থাকে না। তা ছাড়া তাদের অভাব তাদের জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মজার ব্যাপার হল, অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা যেতে পারে। এমন নয় যে পাঁচ মিনিটে গড়ার মন্ত্র আছে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক অনুশীলন। আজ আমরা জানবো আত্মবিশ্বাস বাড়ানো বা আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কার্যকরী উপায়।
তুমি যা যা জানতে পারবে
- আত্মবিশ্বাস কি
- আত্মবিশ্বাস অর্জনের উপায়
- আত্মবিশ্বাস নিয়ে কিছু কথা
- আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায়
- আত্মবিশ্বাসী হওয়ার উপায়
- আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কৌশল
- আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর টিপস
- আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সহজ উপায়
ছোট দিয়ে শুরু করা
তোমার লক্ষ্য অনেক বড় হতে পারে । কিন্তু মনে রেখো, যে কোনও বড় লক্ষ্যই কিন্তু ছোট ছোট লক্ষ্য মিলিয়ে তৈরি হয় । রোজকার যেসব ছোটখাটো বিষয় গুলো যখন তুমি দারুণভাবে সামলাবে, তখন সেগুলোই হয়ে উঠবে আত্মবিশ্বাসের কারণ ।
কীভাবে তুমি নিত্যদিনের খুব সাধারণ অথচ ঝামেলার একটা কাজ সম্পন্ন করছো, কেমন করে প্রতিনিয়ত নিজের রাগ প্রশমন করছো, কিংবা অন্য কারো কাজে সাহায্য করছো-এই সকল বিষয়ই তোমার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহায্য করবে । তাহলে দেখবে ধীরে ধীরে তুমি তোমার লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছ । এমনটা হওয়া জরুরি নয় যে কেবল খুব বড় অর্জনগুলোই হিসাবের খাতায় উঠবে ।
ঝুঁকি নাও শিক্ষাও নেও (আত্মবিশ্বাস কি)
আমাদের অনেকেরই সমস্যা হল, আমরা অনেক কাজ করতে গিয়েও পিছিয়ে আসি ব্যর্থতার ভয়ে । মনে হয়, যদি ওটা না পারি তা হলে লোকে কী বলবে! আত্মবিশ্বাসী মানুষেরাও কিন্তু ঝুঁকি নেন । এমন নয় যে তাঁরাও প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে সফল হন । হারের মুখ তাঁদেরও দেখতে হয় ।
আত্মবিশ্বাসী হলে কেউ ভীত বা উদ্বিগ্ন হয় না এটা ভুল ধারণা । উদ্বেগ, উত্তেজনা এগুলো যেকোনো নতুন কাজ বা প্রচেষ্টার মুখোমুখি হওয়ার স্বাভাবিক অংশ । কোনো ঝুঁকি নেওয়া বা নতুন কোনো কাজে হাত দেওয়ার সময় ভীত বা উদ্বিগ্ন হওয়াটা তোমার মনের স্বাভাবিক অবস্থাকেই প্রকাশ করে ।
বরং এতে করে তুমি আরো নিশ্চিত হতে পারবে যে তুমি যা করতে যাচ্ছ তা সত্যিকার অর্থেই বেশ গুরুত্ববাহী । যে কোনো খেলোয়াড়কে দেখো । তারা অনেক পরিকল্পনা করে থাকেন । সব সময় যে সফল হন তা কিন্তু নয়, অনেক ব্যর্থতা থেকে তাদের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় ।
ব্যর্থতার পরেও আত্মবিশ্বাস হারান না বা পরের ম্যাচে আবার কোনও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হন না । তাই বলছি, জীবনে ঝুঁকি না নিলে এগোতে পারবে না । অবশ্যই তা নিজের সাধ্য বুঝে । আর যদি কোনও কারণে ব্যর্থও হও, ভেঙে পড়ার কিছু নেই । বরং তার থেকে শিক্ষা নিতে হবে । খতিয়ে দেখতে হবে কী কী কারণ তোমার পদক্ষেপগুলো কাজ করল না ।
নিজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া
একটি গবেষণার কথা বলে বিষয়টি বোঝানো যাবে। মার্টিন গবেষক স্যালিগম্যান ১৯৬৭ সালে একবার কয়েকটি পোষা কুকুর নিয়ে তাদের পরীক্ষামূলক ভাবে ইলেকট্রিক শক দেবার ব্যবস্থা করেন ।
তবে তিনি প্রত্যেকবার শক দেবার পূর্বে একটা ঘন্টা বাজাতেন । কিছুদিন পর থেকে দেখা যায় ওই কুকুরগুলো শুধু ঘন্টার শব্দ শুনলেই ভয়ে কুঁকরে যেতে লাগলো । ইলেকট্রিক শক না দিলেও তারা তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুসারে ঘন্টার শব্দকেই ভয় পেতে থাকে । ইলেকট্রিক শক তাদের অভিজ্ঞতা লব্ধ ভয়ের কারণ ।
তেমনি আমাদের জীবনেও দেখি যে কোনো ব্যর্থতার পূর্ব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে দেয় । কুকুরের ওই পরীক্ষা থেকে স্যালিগম্যান একটি তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন যা ”( Learned Helplessness) ” নামে পরিচিত । বাস্তবিক দেখা যায় কোনো মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে ফেলা যায় খুব সহজেই।
তাই বলা হয় নিজের দ্বায়িত্ব নিজে নাও। কারণ তোমার আত্মবিশ্বাস, ক্ষমতা অন্যের উপরে ছেড়ে দিও না । নিজের আত্মবিশ্বাস , ক্ষমতা ও পরিকল্পনার দ্বায়িত্ব নিজে নিতে শুরু করো।
লক্ষ নির্ধারণ করা (আত্মবিশ্বাস কি)
কথায় বলে‘লক্ষ্যহীন জীবন, মাঝিহীন নৌকার মত’। তুমি যদি না জানো তুমি কোথায় যেতে চাও তাহলে তুমি সেখানে কখনও পৌঁছতে পারবে না । চারপাশে তাকিয়ে দেখো শত শত মানুষ যেন ছুটছে আর ছুটছে । যাদের নিজেদের জীবনের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই ।
সমাজে যা দেখে তাই করে । কেউ পরিবার করতে বাধ্য করে বলেই করে । আর কারো রোজগার করা দরকার বলেই করে । কিন্তু নিজের জীবনের লক্ষ্য, প্যাশন কিছুই ঠিক নেই । ফলে ব্যর্থতার সব দায় চাপায় ওই সমাজ, পরিবার কিংবা ভাগ্যের উপর ।
আসলে তাদের লক্ষ্যহীন, পরিকল্পনাহীন অভ্যাসই সম্পূর্ণ দায়ী । যার ফলে নিজের উপর আত্মবিশ্বাসটাই হারিয়ে যেতে থাকে । কাজেই তুমি তোমার জীবনের লক্ষ্য ও পথ নির্ধারণ করে কাজ করতে থাকো দেখবে তুমি তোমার মত আত্মবিশ্বাস পেয়ে যাবে ।
নিজেকে প্রশ্ন করতে শিখুন
আমরা অনেকেই যা করি না তা হল নিজেদেরকে প্রশ্ন করা। প্রশ্ন করা, কোন বিষয়ে আমরা পারদর্শী, বা কোথায় আমাদের ত্রুটি আছে। ধরুন আপনি জনসংযোগ, খেলাধুলা, অধ্যয়ন, সঙ্গীত, চিত্রকলা ইত্যাদির মতো এই ক্ষেত্রগুলির মধ্যে কিছু বিষয়ে খুব দক্ষ,
আপনি এটি একটি নোটবুকে লিখে রাখুন। জীবনের কোন সাফল্য আপনাকে গর্বিত করে? আপনার কোন পয়েন্টের সাথে আপনি একমত নন? আপনি কিভাবে এই ক্ষেত্রগুলিতে উন্নতি করতে পারেন তার উপর সর্বদা ফোকাস করুন।
আবার, আপনার ত্রুটিগুলি সম্পর্কে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন - কি করতে আপনার আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে? আপনার নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য কি? অর্থাৎ, আপনি কি সবকিছুর জন্য দেরি করছেন, আপনি কি সহজেই রেগে যান, নাকি কোনো কঠিন পরিস্থিতি একেবারেই সামলাতে পারছেন না?
আপনি যা পড়াশুনা করেছেন বা করছেন এবং এত দিনে আপনি যে সমস্ত দক্ষতা অর্জন করেছেন তা আপনাকে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট? কোন বৈশিষ্ট্য আপনার অগ্রগতির পথে দাঁড়ানো? প্রক্রিয়া থেকে আপনি যা শিখেছেন তার নোট রাখুন। আর এগুলো নিয়ে কাজ শুরু করুন।
নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেও
বিখ্যাত লেখক জর্জআর.আর. মার্টিন তাঁর “ দি সং অব আইস এ্যান্ড ফায়ার এ গেম অব থ্রোনস” উপন্যাসে লিখেছেন “ নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে লজ্জা করো না । একে তোমার শক্তি বানাও …. ঢাল হিসেবে ব্যবহার করো । তাহলে আর অন্য কেউ এটা তোমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না” ।
দুনিয়ার সবাই সমান হয় না । সৃষ্টিকর্তার এটাই বৈশিষ্ট্য যে কাউকেই সবকিছু গুন দেন না । প্রত্যেকেই কোনো না কোনো দিকে সীমাবদ্ধ । আবার প্রত্যেকের মধ্যেই কোনো না কোনো বিশেষ গুন রয়েছে । তোমার উচিত নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নেওয়া । আর খুঁজে বের করো তোমার সেই বিশেষ গুন বা দক্ষতাকে । যা তোমার সব সীমাবদ্ধতাকে দূর করে সফল করে তুলতে পারে । সুরদাস ছিলেন একজন অন্ধ ।
কিন্তু তার কবিত্ব গুণের জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে অমর হয়ে আছেন । নায়কোচিত রূপ, উচ্চতা না পেয়েও কমেডি অভিনেতা জনি লিভার দেশের মানুষের কাছে জনপ্রিয় । তাই নিজের সীমাবদ্ধতাকে স্বীকার করে, ভেতরের রাজাকে জাগিয়ে তোলা প্রয়োজন । নিজের ক্ষমতা ও গুণের উপরেই আত্মবিশ্বাস নির্ভর করে থাকে.
নিজেকে নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করা (আত্মবিশ্বাস কি)
নিজের সম্পর্কে খারাপ ধারণাগুলো ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে পরিবর্তন করো। অন্যেরা যখন আমাদের সমালোচনা করে তখন সেটা গ্রহণ করতে আমাদের ভীষণ কষ্ট হয় । কিন্তু আমরা যখন সারাক্ষণ নিজের ভেতরে নিজের সমালোচনা করতে থাকি সেটা তো অনায়াসে গ্রহণ করি।
যেমন- আমি পারবো না,আমার দাঁড়া হবেই না,প্রতিনিয়ত নিজের ভুল ধরা, নিজেকে তিরস্কার করা, হাজারটা নিষেধের জালে জড়ানো ইত্যাদি। নিজেকে নিয়ে যে সমালোচনা গুলো আমরা ভেতরে আওড়াতে থাকি তা যদি ভীষন নেতিবাচক হয় তবে তা আমাদের আচরণে ধরা পড়বে। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আত্মবিশ্বাসহীনতার মূল কারণ। তাই এমন ধারণা দেয়, এমন মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকো।
এবং নিজের কট্টর সমালোচক হয়ে নয়, বরং নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে সাহায্য করো নিজেকে। নিজের ভেতরে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়াও। সবার আগে নিজের প্রতি নিজের বিশ্বাস বাড়িয়ে নেয়াটা সবচেয়ে জরুরী। যে মানুষের নিজের ওপর ভরসা নেই, অন্যরাও তার ওপর ভরসা করতে ভয় পায়।
বই পড়া
একজন মানুষের মানসিক বিকাশের জন্য বইয়ের বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। তাই নিয়মিত বই পড়ার অভ্যেস তৈরি করো। আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য সফল মানুষদের জীবনীমূলক বইগুলো পড়ো। তাঁদের সফলতার পেছনের গল্পটি থেকে আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণা যোগাও।
তাঁদের মতো তুমিও একদিন পারবেই। শুধু নিজের ওপর এই বিশ্বাসটি রাখতে হবে। এছাড়া সেল্ফ হেলফ বই গুলো পড়তে পারো যা তোমার সেল্ফ ইস্টিমকে অনেকখানি বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করবে।
তুমি জীবনে কতটা উন্নতি করবে, কতটা অর্থ বা খ্যাতি অর্জন করবে, সংসার ও পারিবারিক জীবনে কতটা সুখী হবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে তোমার আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মানের ওপর।
নিজের ব্যাপারে তুমি কেমন অনুভব করো , নিজের ব্যাপারে তোমার ভাবনা কি রকম – এসব তোমার জীবনে এগিয়ে চলার জন্য অনেক বেশি জরুরী বিষয়। তাই নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস থাকাটা ভীষণ জরুরী। আশা করি আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য উপরের কার্যকরী টিপস তোমার অনেকটাই কাজে লাগবে।
আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায় লেখাটি তোমাদের কেমন লাগলো আমাদের কমেন্টের মাধ্যমে জানাতে পারো।